Thursday, November 3, 2011

তুমি চলে যাচ্ছো

..........নির্মলেন্দু গুণ
তুমি চলে যাচ্ছো, নদীতে কল্লোল তুলে লঞ্চ ছাড়ছে,
কালো ধোঁয়ার ধস ধস আওয়াজের ফাঁকে ফাঁকে
তোমার ক্লান্ত অপস্রিয়মাণ মুখশ্রী,--সেই কবে থেকে
তোমার চলে যাওয়ার দিকে থাকিয়ে রয়েছি।
তুমি চলে যাচ্ছো, তোমার চলে যাওয়া কিছুতেই
শেষ হচ্ছেনা, সেই কবে থেকে তুমি যাচ্ছো, তবু
শেষ হচ্ছেনা, শেষ হচ্ছেনা।

বাতাসের সঙ্গে কথা বলে, বৃষ্টির সঙ্গে কথা বলে
ধলেশ্বরীর দিকে চোখ ফেরাতেই তোমাকে আবার দেখলুম;
আবার নতুন করে তোমার চলে যাওয়ার শুরু।
তুমি চলে যাচ্ছো, নদীতে কল্লোল তুলে লঞ্চ ছাড়ছে,
কালো ধোঁয়ার ফাঁকে ফাঁকে তোমার ক্লান্ত অপস্রিয়মাণ
মুখশ্রী, যেন আবার সেই প্রথমবারের মতো চলে যাওয়া।
তুমি চলে যাচ্ছো, আমি দুই চোখে তোমার চলে যাওয়ার
দিকে তাকিয়ে রয়েছি, তাকিয়ে রয়েছি।

তুমি চলে যাচ্ছো, নদীতে কান্নার কল্লোল,
তুমি চলে যাচ্ছো, বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ,
তুমি চলে যাচ্ছো, চৈতন্যে অস্থির দোলা, লঞ্চ ছাড়ছে,
টারবাইনের বিদ্যুৎগতি ঝড় তুলছে প্রাণের বৈঠায়।
কালো ধোঁয়ার দূরত্ব চিরে চিরে ভেসে উঠছে তোমার
অপস্রিয়মাণ মুখশ্রী, তুমি ডুবতে ডুবতে ভেসে উঠছো।
তোমার চলে যাওয়া কিছুতেই শেষ হচ্ছেনা,
তিন হাজার দিন ধরে তুমি যাচ্ছো, যাচ্ছো আর যাচ্ছো।


তুমি চলে যাচ্ছো, আকাশ ভেঙে পড়ছে তরঙ্গিত
নদীর জোৎস্নায়, কালো রাজহংসের মতো তোমার নৌকো
কাশবনের বুক চিরে চিরে আখক্ষেতের পাশ দিয়ে
যাচ্ছে অজানা ভুবনের ডাকে। তুমি চলে যাচ্ছো,
আকাশ ভেঙে পড়ছে আকাশের মতো।
হে তরঙ্গ, হে সর্বগ্রাসী নদী, হে নিষ্ঠুর কালো নৌকা,
তোমরা মাথায় তুলে যাকে নিয়ে যাচ্ছো
সে আমার কিছুই ছিল না, তবু কেন সন্ধ্যার আকাশ
এরকম ভেঙে পড়লো নদীর জোৎস্নায়?
ভেঙে পড়লো জলের অতলে? তুমি চলে যাচ্ছো বলে?


তুমি চলে যাচ্ছো, ল্যাম্পপোস্ট থেকে খসে পড়ছে বাল্ব,
সমস্ত শহর জুড়ে নেমে আসছে মাটির নিচের গাঢ় তমাল তমসা।
যেন কোনো বিজ্ঞ-জাদুকর কালো স্কার্ফ দিয়ে এ শহর
দিয়েছে মুড়িয়ে। দু'একটি বিষণ্ণ ঝিঁঝিঁ ছাড়া আর কোনো গান নেই,
শব্দ নেই, জীবনের শিল্প নেই, নেই কোনো প্রাণের সঞ্চার।
এ শহর অন্ধ করে তুমি চলে যাচ্ছো অন্য এক দূরের নগরে,
আমি সেই নগরীর কাল্পনিক কিছু আলো চোখে মেখে নিয়ে
তোমার গন্তব্যের দিকে, নীলিমায় তাকিয়ে রয়েছি।
তুমি চলে যাচ্ছো, তোমার বিদায়ী চোখে, চশমায় নুহের প্লাবন।
তুমি চলে যাচ্ছো, বিউগলে বিষণ্ণ সুর ঝড় তুলছে
অন্তর্গত অশোক কাননে। তুমি চলে যাচ্ছো, তোমার পশ্চাতে
এক রিক্ত, নিঃস্ব মৃতের নগরী পড়ে আছে।


অনন্ত অস্থির চোখে বেদনার মেঘ জমে আছে,
তোমার মুখের দিকে তাকাতে পারি না।
তোমাকে দেখার নামে তোমার চতুর্দিকে পরিপার্শ্ব দেখি,
বিমানবন্দরে বৃষ্টি, দু'চোখ জলের কাছে ছুটে যেতে চায়,
তোমার চোখের দিকে তাকাতে পারি না।


তুমি চলে যাচ্ছো, আমার কবিতাগুলো শরবিদ্ধ
আহত সিংহের ক্ষোভ বুকে নিয়ে প'ড়ে আছে একা।
তুমি চলে যাচ্ছো, কতগুলো শব্দের চোখে জল।

Thursday, January 6, 2011

সরোদ বাজাতে জানলে

---------- পূর্ণেন্দু পত্রী
আমার এমন কিছু দুঃখ আছে যার নাম তিলক-কামোদ
এমন কিছু স্মৃতি যা সিন্ধুভৈরবী
জয়জয়ন্তীর মত বহু ক্ষত রয়ে গেছে ভিতরে দেয়ালে
কিছু কিছু অভিমান
ইমন-কল্যাণ।
সরোদ বাজাতে জানলে বড় ভাল হতো।
পুরুষ কীভাবে কাঁদে সে-ই শুধু জানে।
কার্পেট সাজানো প্রিয় অন্তঃপুরে ঢুকে গেছে জল।
মুহুর্মুহু নৌকোডুবি, ভেসে যায় বিরুদ্ধ নোঙর।
পৃথিবীর যাবতীয় প্রেমের সপ্তডিঙা ডুবছে যেখানে
সেখানে নারীর মত পদ্ম ফুটে থাকে।
জল হাসে, জলতার চুড়িপরা হাতে,
নর্তকীর মত নেচে ঘুরে ঘুরে ঘাগরার ছোবলে
সবকিছু কেড়ে নেয়, কেড়ে নিয়ে ফের ভরে দেয়
বাসি-হয়ে-যাওয়া বুকে পদ্মগন্ধ, প্রকাণ্ড উদ্যান।
এই অপরূপ ধ্বংস, মরচে-পড়া ঘরের-দোরে চাঁপা রঙে এই চুনকাম
দরবারী কানাড়া এরই নাম ?
সরোদ বাজাতে জানলে বড় ভাল হতো।
পুরুষ কীভাবে বাঁচে সে-ই শুধু জানে।