Friday, October 9, 2009

অভিসার মানে যাওয়া কিন্তু যাওয়া ততটা নয় যতটা যেতে চাওয়া

সাবানের ঠান্ডা গন্ধ, অবিরাম জলপড়ার শব্দ এবং স্নান
করতে করতে আমার মায়ের খোলা গলায় নিজের মনে গেয়ে
যাওয়া রবীন্দ্র সঙ্গীত-আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ মানে এই সব।

আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ মানে ২৫শে বৈশাখের আনন্দ উতসব
নয়,বাইশে শ্রাবেণের ব্যথা নয়, জোড়াসাকুর ঠাকুরবাড়ি কিংবা
বোলপুড়ির বিশ্বভারতী আমি কোথাও তাকে তেমন ভাবে পাইনা।
যেমন পাই আমার মায়ের খোলা গলার গানে তবে তাও যখন তখন

কিংবা যেমন তেমন নয়। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসা শেষ বিকেলে
আমার মা যখন অফিস থেকে ফিরে স্নানঘরে শুদ্ধ হতে যান তখন।

আমার মা, আমার মা কখনো গান শিখেননি
কেন শিখেননি? এমন গলা
মা বলেন ?রবি ঠাকুরের গান তো তানের নয়... প্রানের। তাই?
আমার মায়ের একটি প্রিয় গান
?কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসারই ঘায়ে?
নিবিড় বেদনাতে পুলক লাগে গায়ে
তোমার অভিসারে যাব অগম-পারে
চলিতে পথে পথে বাজুক ব্যথা পায়ে?

গানটা মায়ের মুখে শুনতে শুনতে
এ গানটা কখন আমার আপনার হয়ে গেছে।
সেদিন বিকেল হতে না হতেই অন্ধকার ঘনিয়ে এলো
আমাদের এক রত্তি বাগানে কচি কচি গাছগুলো
ভেজা ভেজা বাতাসে উথাল পাথাল হতে লাগলো
ঝর ঝর বৃষ্টির অবিরাম ধারায় ভিজতে ভিজতে
আমি মায়ের মতোই খোলা গলায় গাইতে লাগলাম

তোমার অভিসারে যাব অগম-পারে
চলিতে পথে পথে বাজুক ব্যথা পায়ে

-অভিসার মানে কি মা?
মা বললেন। ?অভিসার কোথায় পেলে??
-কেন? তোমার গানে
-আমার গানে অভিসার? ও তোমারো অভিসারে যাবো অগম-পারে
-হ্যাঁ ঠিক ওখানে
-অভিসার মানে যাওয়া কিন্তু যাওয়া ততটা নয় যতটা যেতে চাওয়া

সপসপে ভিজে জামায় বাড়িতে এসে দেখি
বাবা অফিস থেকে ফিরে এসেছে কখন
বললেন, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কোনো বর্ষার গান এলো না মনে?

বাবাকে আমি কেমন করে বোঝাই যে
অভিসার শব্দের মানেটা এখন আমি জেনে গেছি
আজি জেনেছি , জেনেছি ভালোবাসার আঘাতে কেমন করে কাঁদা যায়
এইসব নিয়েই আমার রবীন্দ্রনাথ
আমার রবীন্দ্রনাথকে আমি এভাবেই মেঘলা আকাশে
বাদল বাতাসে, সাবেনের গন্ধে, জল পড়ার শব্দে,
বিকেলের মরে যাওয়া আলো অন্ধকারে বার বার পেতে চাই,
বছরের পর বছর প্রতি বছর! যত দিন যাবে

কথায় কথায় যে রাত হয়ে যায়

---------পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়
কথায় কথায় যে রাত হয়ে যায়
কি কথা রাখলে বাকী
খুঁজে দেখনা বুঝে দেখনা
ভেবে দেখনা তাকি জাননা
কিছু না বলে চে গিয়ে
মনকে দিওনা ফাঁকি ।

তোমার চোখের আলোয়
আমি এ মন করেছি আলো
আমায় ভালো বাসায়
তুমি প্রকাশ প্রদীপ জ্বালো
প্রিয় ভাষিনী কথা রাখনি
আশায় আশায় কত যে আর
শুধুই বসে থাকি ।

আজ কি তোমার স্বপন দেখার
সময় নিয়ে নিয়ে
যায়রে সব হারিয়ে

তোমার প্রথম ডাকে
আমি অনেক দিয়েছি সাড়া
তোমার মনের ছায়ায়
আমি ঘুরে ঘুরে দিশাহারা
প্রিয় ভাষিনী কথা রাখনি
ফাগুন এসে অজান্তে আজ
হোল কি বৈশাখী ।

Wednesday, October 7, 2009

আমি কিরকম ভাবে বেঁচে আছি

---------সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ
এই কী মানুষজন্ম? নাকি শেষ
পরোহিত-কঙ্কালের পাশা খেলা! প্রতি সন্ধ্যেবেলা
আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে, হৃদয়কে অবহেলা
করে রক্ত; আমি মানুষের পায়ের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে
থাকি-তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে। আমি আক্রোশে
হেসে উঠি না, আমি ছারপোকার পাশে ছারপোকা হয়ে হাঁটি,
মশা হয়ে উড়ি একদল মশার সঙ্গে; খাঁটি
অন্ধকারে স্ত্রীলোকের খুব মধ্যে ডুব দিয়ে দেখেছি দেশলাই জ্বেলে-
(ও-গাঁয়ে আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই!)

আমি স্বপ্নের মধ্যে বাবুদের বাড়িরে ছেলে
সেজে গেছি রঙ্গালয়ে, পরাগের মতো ফুঁ দিয়ে উড়িয়েছি দৃশ্যলোক
ঘামে ছিল না এমন গন্ধক
যাতে ক্রোধে জ্বলে উঠতে পার। নিখিলেশ, তুই একে
কী বলবি? আমি শোবার ঘরে নিজের দুই হাত পেকেরে
বিঁধে দেখতে চেয়েছিলাম যীশুর কষ্ট খুব বেশি ছিল কিনা;
আমি ফুলের পাশে ফূল হয়ে ফূটে দেখেছি, তাকে ভালোবাসতে পারি না।
আমি ফুলের পাশে ফূল হয়ে ফূটে দেখেছি, তাকে ভালোবাসতে পারি না।
আমি কপাল থেকে ঘামের মতন মুছে নিয়েছি পিতামহের নাম,
আমি শ্মশানে গিয়ে মরে যাবার বদলে, মাইরি, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
নিখিলেশ, আমি এই-রকমভাবে বেঁচে আছি, তোর সঙ্গে
জীবনবদল করে কোনো লাভ হলো না আমার -একি নদীর তরঙ্গে
ছেলেবেলার মতো ডুব সাঁতার?- অথবা চশমা বদলের মতো
কয়েক মিনিট আলোড়ন? অথবা গভীর রাত্রে সঙ্গমনিরত
দম্পতির পাশে শুয়ে পুনরায় জন্ম ভিক্ষা? কেননা সময় নেই,
আমার ঘরের
দেয়ালের চুন-ভাঙা দাগটিও বড় প্রিয়। মৃত গাছটির পাশে উত্তরের
হাওয়ায় কিছুটা মায়া লেগে ভুল নাম, ভুল স্বপ্ন থেকে বাইরে এসে
দেখি উইপোকায় খেয়ে গেছে চিঠির বান্ডিল, তবুও অক্লেশে
হলুদকে হলুদ বলে ডাকতে পারি। আমি সর্বস্ব বন্ধক দিয়ে একবার
একটি মুহূর্ত চেয়েছিলাম, একটি ….., ব্যক্তিগত জিরো আওয়অর;
ইচ্ছে ছিল না জানাবার
এই বিশেষ কথাটা তোকে। তবু ক্রমশই বেশি করে আসে শীত, রাত্রে
এ-রকম জলতেষ্টা আর কখনও পেতো না, রোজ অন্ধকার হাত্‌ড়ে
টের পাই তিনটে ইঁদুর না মূষিক? তা হলে কি প্রতীক্ষায়
আছে অদুরেই সংস্কৃত শ্লোক? পাপ ও দুঃখের কথা ছাড়া আর এই অবেলায়
কিছুই মনে পড়ে না। আমার পূজা ও নারী-হত্যার ভিতরে
বেজে ওঠে সাইরেন। নিজের দু’হাত যখন নিজেদের ইচ্ছে মতো কাজ করে
তখন মনে হয় ওরা সত্যিকারের। আজকাল আমার
নিজের চোখ দুটোও মনে হয় একপলক সত্যি চোখ। এরকম সত্য
পৃথিবীতে খুব বেশী নেই আর।।

Sunday, October 4, 2009

জল বাড়ছে

------------সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
কেউ জানে না, গোপন- গোপনে জল উঠছে
জল বাড়ছে তিস্তায়, জল বাড়ছে তোর্সা
রাইডাক কালজানি নদীতে
জল বাড়ছে, জল বাড়ছে, শুকনো নদীগুলো
এখন উন্মাদিনী
নেমে আসছে পাহাড়ী ঢল, ভেসে যাচ্ছে ফসলের ক্ষেত,
ভেঙে পড়ছে চা-বাগান
ডুবছে গ্রাম, চুয়াপাড়া, হাসিমারা, বাকসাদুয়ার
জল বাড়ছে মহানন্দায়, জল বাড়ছে পুনর্ববা
নাগর এবং কালিন্দীতে
ক্রুদ্ধ বিদ্রোহী জল ফুঁসে ফুঁসে উঠছে
ঝাপটা মারছে হাতে হাত মিলিয়ে
ভেঙে পড়ছে ভালুকা, রতুয়া, বলরামপুর, ইংলিশবাজার
ঘুমন্ত গ্রামগুলির ওপর দিয়ে হুড়হুড় করে
এগিয়ে আসছে জলস্রোত
জল বাড়ছে অজয়, মুন্ডেশ্বরী, কেলেঘাই নদীতে
জল বাড়ছে গঙ্গায়, পদ্মায়, যমুনায়, দামোদরে
জল বাড়ছে, জল বাড়ছে
রোগা জল, কালো জল, দুঃখী জল, ভীতু জল
বুকের পাঁজরার মতো, তানপুরায় টঙ্কারের মতো
উড়ন্ত রুমালের মতো
জলের চঞ্চল খেলা
শত-শত ভ্রমরীর সহসা দিগন্তে উড়ে যাওয়া
অন্তরীক্ষ জুড়ে একটা ঘোর শব্দ- যা সংগীত নয়
ফারাক্কা ডি-ভি-সি’র বাঁধে প্রবল ধাক্কা দিচ্ছে জল
যেন লক্ষ-লক্ষ বাহু-
এবার সব ভেঙে পড়বে
জল উপচে এসে বর্ধমান, আসানসোল, দুর্গাপুরে
শোনা যাচ্ছে সমিমিলিত গর্জন
ওরা আর পিছিয়ে যাবে না
জল বাড়ছে, জল বাড়ছে
সমস্ত ঘুম ভেঙে দেবে এবার
জল গড়িয়ে এসেছে কলকাতার ময়দানে
চতুর্দিকে থেকে শহরকে ঘিরে দৌড়ে আসছে ওরা
লাল, নীল, সবুজ বিভিন্ন রঙের
পতাকা ওড়ানো অফিসে দুমদাম করে
ধাক্কা দিচ্ছে জল
জল বাড়ছে, জল বাড়ছে
এইমাত্র তারা ঢুকে এলো অফিস পাড়ায়
বিনয় বাদল দীনেশের মতো দুর্দান্ত সাহসী জল
লাফিয়ে উঠে পড়লো রাইটার্স বিল্ডিংস এর বারান্দায়…..

Thursday, October 1, 2009

দ্বিধা

-----------মহাদেব সাহা
আমি এখনো বহু বিষয়ে মন ঠিক করতে পারিনি
যেমন কোনোদিন আমি বিয়ে করবো কি করবো না
অথবা কোনোদিন যাবো কি না বেশ্যালয়ে
কাউকে কখনো খুন করবো কি,
কোনোদিন চরস খেয়ে পড়ে থাকবো কিনা রাস্তায়
অথবা কিনা কোনো ফকির দরবেশের সাথে চলে
যাবো ধর্মশালায়
কোনো একদিন লাটভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের এই দুঃখ-
ধান্ধার জন্যে
খুব চেঁচিয়ে গালাগাল করবো কি না
একদিন সারারাত ঢিল ছুঁড়ে ভাঙবো কিনা ডিআইটি-র ঘরি
কোনোদিন সন্ধ্যেবেলা
পাওয়ার হাউসের সুইচটা টিপে
সারা শহরে বাধিয়ে দেবো কি না ভুতুরে কান্ড
……………………………….
……………………………….
মতিঘিলের বাণিজ্য এলাকায় পর পর কয়েক সপ্তাহ চালাবো
কিনা হরতাল
অথবা সস্তা জনসেবার বক্তৃতা দিয়ে নিজের আখের গোছাবো কিনা
নাকি হুজুর হুজুর করে কাটিয়ে দেবো জীবনটা
সত্যি কোনোদিন আমি এই দায়িত্বশীল লোকটা
যাচ্ছেতাই একটা কিছু করে বসবো কিনা
এমনি বহু বিষয়ে আমি এখনো মন ঠিক করতে পারিনি-

আপন মানুষদের কাছে ফিরে যাবো

----------------- মহাদেব সাহা

আপন মানুষদের কাছে ফিরে যাবো

এখানে মানুষ থাকে, এই নির্দয় নিষ্প্রাণ দেশে,
এই লৌহপুরীতে?
এই শহরের ভিড়ে পাখিদের ওড়াউড়ি নেই,
গাভীর হাম্বা রব কখনো শুনি না;
শুধু অচেনা মানুষের কোলাহল, গাড়ির কর্কশ শব্দ

বাড়ির উঠানে এখানে ওঠে না চাঁদ, নদীময় তারাভরা
দেখি না আকাশ
জুড়ায় না ক্লান্ত দেহ দখিনা বাতাস

এখানে মানুষেরা এক সাথে হেঁটে যায় কেই কাউকে চেনে না, মানুষ
এখানে থাকে?
ঢের হয়েছে বিদ্যা, ঢের হয়েছে প্রাপ্তি, তবু যেটুকু জীবন
আছে, বুকে নিয়ে
এবার আপন মানুষদের কাছে ফিরে যাবো, গলা
ছেড়ে ডাকবো বাহার কাকা,
কানু ভাই তোমরা কোথায়?
ছি, এখানে মানুষ থাকে, এই সোনার খাঁচায়, ইটের জঙ্গলে,
বন্দিশালায়
হোটেলের বদ্ধ ঘরে, ফ্ল্যাট বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে
বৈদ্যুতিক আলোর এই অন্ধকারে,
এই স্নেহহীন, মায়াহীন, জলবায়ু শুন্য জতুগৃহে?
কতোদিন শুনি না ঘুঘুর ডাক, রাখালের বাঁশি,
টানা বাতাসের শব্দ
দেখিনা সবুজ মাঠ, উধাও দিগন্ত
ঘরের পিছনের ছোট্ট জংলায় দোয়েলের উড়াউড়ি,
কোথাও দেখিনা একটি ধানের শীষে গঙ্গাফড়িং,
লাউ জাংলার পাশে স্থলপদ্ম,
এখানে কী পেয়েছি প্রচুর সুখ, পেয়েছি প্রচুর শান্তি,

এবার অর্ধেক মানুষ আমি খুইয়ে এখানে
সব অনুভুতি, শুদ্ধতা, আনন্দ
সেই আপন মানুষদের কাছে ফিরে যাবো।
সেই বন্ধুগাছ, বন্ধুপাখি, ডোবার কচুরি ফুল,
সেই কাদামাটি জলে ভেজা বাড়ি
কাজলাদিদির কথা লেখা সেই পাঠ্যবই, তোমাদের কারো
কিছুই জানি না;
পাখিরা যেমন আপন পাখিদের সাথে মিশে যায়
আমিও তেমনি আপন মানুষদের মাঝে মিশে যাবো
প্রিয় বৃক্ষ, প্রিয় নদী, আপন মানুষ।

উপেক্ষা

-------- নির্মলেন্দু গুণ

অনন্ত বিরহ চাই, ভালোবেসে কার্পণ্য শিখিনি৷
তোমার উপেক্ষা পেলে অনায়াসে ভুলে যেতে পারি
সমস্ত বোধের উত্স গ্রাস করা প্রেম; যদি চাও
ভুলে যাবো, তুমি শুধু কাছে এসে উপেক্ষা দেখাও৷

আমি কি ডরাই সখি, ভালোবাসা ভিখারি বিরহে?

অমলকান্তি

--------------- নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

অমলকান্তি আমার বন্ধু,
ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।
রোজ দেরি করে ক্লাসে আসতো, পড়া পারত না,
শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে
এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতো যে,
দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের।

আমরা কেউ মাষ্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি।
সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল!
ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর,
জাম আর জামরুলের পাতায়
যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন লেগে থাকে।

আমরা কেউ মাষ্টার হয়েছি, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায় কাজ করে।
মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে;
চা খায়, এটা-ওটা গল্প করে, তারপর বলে, “উঠি তাহলে।”
আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।

আমাদের মধ্যে যে এখন মাষ্টারি করে,
অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত,
যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল,
উকিল হলে তার এমন কিছু ক্ষতি হত না।
অথচ, সকলেরই ইচ্ছেপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সেই অমলকান্তি–রোদ্দুরের কথা ভাবতে-ভাবতে
ভাবতে-ভাবতে
যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।

স্নান

----------------জয় গোস্বামী

সংকোচে জানাই আজ: একবার মুগ্ধ হতে চাই।
তাকিয়েছি দূর থেকে। এতদিন প্রকাশ্যে বলিনি।
এতদিন সাহস ছিল না কোনো ঝর্ণাজলে লুণ্ঠিত হবার -
আজ দেখি অবগাহনের কাল পেরিয়ে চলেছি দিনে দিনে …

জানি, পুরুষের কাছে দস্যুতাই প্রত্যাশা করেছো।
তোমাকে ফুলের দেশে নিয়ে যাবে ব’লে যে-প্রেমিক
ফেলে রেখে গেছে পথে, জানি, তার মিথ্যে বাগদান
হাড়ের মালার মতো এখনো জড়িয়ে রাখো চুলে।

আজ যদি বলি, সেই মালার কঙ্কালগ্রন্থি আমি
ছিন্ন করবার জন্য অধিকার চাইতে এসেছি? যদি বলি
আমি সে-পুরুষ, দ্যাখো, যার জন্য তুমি এতকাল
অক্ষত রেখেছো ওই রোমাঞ্চিত যমুনা তোমার?

শোনো, আমি রাত্রিচর। আমি এই সভ্যতার কাছে
এখনো গোপন ক’রে রেখেছি আমার দগ্ধ ডানা;
সমস্ত যৌবন ধ’রে ব্যধিঘোর কাটেনি আমার। আমি একা
দেখেছি ফুলের জন্ম মৃতের শয্যার পাশে বসে,
জন্মান্ধ মেয়েকে আমি জ্যোৼস্নার ধারণা দেব ব’লে
এখনো রাত্রির এই মরুভুমি জাগিয়ে রেখেছি।

দ্যাখো, সেই মরুরাত্রি চোখ থেকে চোখে আজ পাঠালো সংকেত -
যদি বুঝে থাকো তবে একবার মুগ্ধ করো বধির কবিকে;
সে যদি সংকোচ করে, তবে লোকসমক্ষে দাঁড়িয়ে
তাকে অন্ধ করো, তার দগ্ধ চোখে ঢেলে দাও অসমাপ্ত চুম্বন তোমার…
পৃথিবী দেখুক, এই তীব্র সূর্যের সামনে তুমি
সভ্য পথচারীদের আগুনে স্তম্ভিত ক’রে রেখে
উন্মাদ কবির সঙ্গে স্নান করছো প্রকাশ্য ঝর্ণায়।